এনডিটিভি
রাশিয়া থেকে তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার একটি বিল অনুমোদন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট। বিলটি পাস হওয়ার ফলে রাশিয়ার জ্বালানি কিনতে থাকা ভারত, চীনসহ কয়েকটি দেশের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরির পথ খুলে গেল।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করার প্রেক্ষাপটে মস্কোর ওপর চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিলটিতে রাশিয়ার জ্বালানি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এবং রাশিয়ার তেল পরিবহনে ব্যবহৃত কিছু জাহাজের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সিনেটে বিলটি ৮৬-১১ ভোটে পাস হয়। রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক—দুই দলের সদস্যদের সমর্থন পাওয়ায় এর পক্ষে ব্যাপক দ্বিদলীয় ঐকমত্যের চিত্র দেখা গেছে।
বিলটির নামকরণ করা হয়েছে গত ১১ জুলাই মারা যাওয়া রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের স্মরণে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে সরব ছিলেন তিনি। সিনেটে গ্রাহামের স্থলাভিষিক্ত হওয়া তাঁর বোন ডার্লিন গ্রাহাম বিলটি সম্পর্কে বলেন, এটি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করবে।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথালও এক বছরের বেশি সময় ধরে বিলটি পাসের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। ভোটের পর তিনি বলেন, ইউক্রেনের মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে তারা একা নয়।
ব্লুমেনথাল বলেন, ‘আজ আমরা ইউক্রেনের মানুষকে বলছি, আপনারা একা নন। আর ভ্লাদিমির পুতিনকে বলছি, আপনি ইউক্রেন জয় করতে পারবেন না।’
ভারত-চীনের ওপর শুল্কের ক্ষমতা
সিনেটে পাস হওয়া বিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো রাশিয়া থেকে তেল বা গ্যাস আমদানি করা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের বিরুদ্ধে বড় ধরনের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়া।
এই তালিকায় রয়েছে ভারত ও চীন। রাশিয়ার জ্বালানি কেনার দিক থেকে দেশ দুটি মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। ফলে বিলটি কার্যকর হলে ভারত ও চীনের ওপর মার্কিন বাণিজ্যিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
ভারত ও চীনের পাশাপাশি রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় রয়েছে আজারবাইজান, হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া।
তবে বিলটিতে কিছু ক্ষেত্রে ছাড়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কোনো দেশ যদি রাশিয়া থেকে তার মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৫ শতাংশের কম আমদানি করে এবং সেই আমদানি আরও কমানোর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সেই দেশের ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপের বিষয়ে ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
এর ফলে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বজায় রাখা দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরির পাশাপাশি ইউরোপের কিছু দেশের জন্যও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
পুতিন ও রুশ জ্বালানি খাতও নিষেধাজ্ঞার আওতায়
বিলটিতে শুধু রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতাদের ওপর চাপ তৈরির ব্যবস্থা রাখা হয়নি। রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ওপরও নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিল অনুযায়ী, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, দেশটির জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি প্রকল্পের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে।
এ ছাড়া রাশিয়ার তেল পরিবহনে ব্যবহৃত পুরোনো জাহাজের একটি বহরও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার সুযোগ রাখা হয়েছে। রাশিয়া এসব জাহাজের পতাকা বা নিবন্ধন পরিবর্তন করে তেল পরিবহনের মাধ্যমে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে থাকে বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ।
এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো রাশিয়ার তেল রপ্তানি থেকে অর্জিত রাজস্বের প্রবাহ আরও সীমিত করা এবং মস্কোর যুদ্ধ পরিচালনার অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
ট্রাম্পের হাতে থাকছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ক্ষমতাও
তবে বিলটি শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতা বাড়ায়নি। জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন হলে প্রেসিডেন্টকে নিষেধাজ্ঞা বা সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের সুযোগও দেওয়া হয়েছে।
তবে এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসকে বোঝাতে হবে যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা শিথিল করার সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয়।
অর্থাৎ, বিলটি একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনকে রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতাদের ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ তৈরির ক্ষমতা দিচ্ছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক বা জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় সেই চাপ কমানোর কিছু ক্ষমতাও প্রেসিডেন্টের হাতে রাখছে।
প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদন এখন বাকি
সিনেটে পাস হলেও বিলটি এখনো চূড়ান্ত আইনে পরিণত হয়নি। পরবর্তী ধাপে এটি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে যাবে। আগামী ৩১ আগস্ট প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশন পুনরায় শুরু হলে সেখানে বিলটি নিয়ে আলোচনা ও ভোট হতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদে অনুমোদন পাওয়ার পর প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
সিনেটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিল পাস হওয়ায় প্রতিনিধি পরিষদেও এটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমর্থন পেতে পারে। তবে সেখানে বিলটির চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আইনপ্রণেতাদের অবস্থান এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কংগ্রেসের সমন্বয়ের ওপর।
রাশিয়ার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা
রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি বিলটিতে ইরান সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানও রাখা হয়েছে। এতে ১৯৯৬ সালের ইরান নিষেধাজ্ঞা আইনের মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
এই আইনের আওতায় ইরানের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। ফলে নতুন বিলটি শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তৈরি হলেও এর প্রভাব ইরানের জ্বালানি খাত এবং দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করা আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর ওপরও পড়তে পারে।
ভারত ও চীনের জন্য নতুন চাপ
সিনেটের এই ভোটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ভারত ও চীনের মতো রাশিয়ার বড় জ্বালানি ক্রেতাদের ওপর সম্ভাব্য নতুন মার্কিন চাপ।
রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করা হলে তা শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, পরিবহন ব্যয় এবং পণ্যের দামের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এখনই ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হচ্ছে না। সিনেটে পাস হওয়া বিলটি প্রথমে প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদন পেতে হবে এবং পরে তা আইনে পরিণত হতে হবে। এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বাস্তবে কোন দেশ বা কোন মাত্রায় শুল্ক আরোপ করবেন, সেটিও নির্ভর করবে তাঁর প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
সব মিলিয়ে, সিনেটে বিলটির পাস রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ আরও বিস্তৃত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে এটি ভারত ও চীনের মতো রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ক্রেতাদের জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল করে তুলতে পারে।